• India
  • Last Update 11.30 am
  • 29℃ Kolkata, India
news-details
Food

শীতের কলকাতায় এক লুপ্ত হোটেলের সন্ধানে!

ad

শীর্ষ টাইমস:আমরা এখন তিনতারা পাঁচতারা এমনকি সাততারা হোটেল দেখতে পাই কলকাতা শহরের নানান প্রান্তে। সাধারণ মানুষ থেকে গণ্য-মান্য, বিত্তশালী মানুষ সবার জন্যই রয়েছে বিভিন্ন মানের ও দামের থাকার হোটেলের ব্যবস্থা। কিন্ত কখনও কি ভেবে দেখেছেন যে এই কলকাতার বুকেই প্রায় ২০০ বছর আগে গড়ে উঠেছিল এশিয়ার প্রথম হোটেল। সেই হোটেলেরই গল্প বলবো আজ।

হোটেলের নাম 'spence's' স্পেন্সে'স। এমন নাম হওয়ার কারণ কোনও এক জন স্পেন্স সাহেব ১৮৩০ সালে কলকাতায় এই হোটেল তৈরি করেন। তৎকালীন কলকাতা ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দৌলতে জমজমাট। সারা বছর ইংল্যান্ড এবং অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশের মার্চেন্ট, ছোট বড় ব্যবসায়ী আর গভর্নমেন্টের উচ্চপদস্থ হোমড়াচোমড়াদের আনাগোনা লেগেই থাকত। কখনও সরকারি কাজে তো কখনও ব্যবসার কাজে সাদা চামড়ার লোকজন কলকাতা আসলে তাঁদের থাকা খাওয়ার ঢালাও ব্যবস্থা না থাকলে কি চলে? সেই সব ভেবেই কোম্পানি অনুমতি দিল গর্ভনর হাউস বা এখন যেটা রাজভবন তার পশ্চিমদিকের গেটের কাছেই এই হোটেল বানানোর। সেইমতো তৈরি হল মাল্টিস্টোরিড এই বিল্ডিং। বিশাল জায়গায় ছড়ানো, গথিক স্ট্রাকচার আর্চ ,দানবাকৃতি কলাম এসব নিয়ে এ বিল্ডিং-এর জৌলুস তখন গভর্নর হাউসকেও হার মানায়। বিদেশ অবদি ছড়িয়ে গেল স্পেন্সেস-এর নাম। বিখ্যাত সাহিত্যিক জুলে ভার্ন তাঁর 'স্টিম হাউস ' উপন্যাসে লিখলেন এ হোটেলের কথা। নামকরা বিলিতি কোম্পানির বাথরুম ফিটিংস,শীততাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা,সুসজ্জিত অন্দরসাজ, রুম সার্ভিস, সেভেন কোর্স মিলের আয়োজন,এমনকি একটি ওপেন টেরেস অবদি ছিল এই হোটেলে। তৎকালীন কলকাতার বুকে এ দেশীয়রা যদিও সেই হোটেলে কিছুটা ব্রাত্যই ছিল। তবে দেশীয় রাজা মহারাজারাদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন সময়ে অতিথি হন এখানে। ১৮৬১ তে এমনভাবেই মিলিত হন লাহোর চুক্তিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এক মা ও ছেলে। পাঞ্জাবের শেষ মহারানী জিন্দ কাউর ও তাঁর পুত্র দলিপ সিং। ১৮৬৭ তে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিলেত থেকে ফিরেই এই হোটেলে ওঠেন। কয়েকমাস এখানেই থাকেন। তখন এখানে মাসে ভাড়া ছিল ৩০০ টাকার ওপরে। যা সেই সময়ে অনেক টাকা। কিন্ত দেনার দায়ে সর্বসান্ত মধুসূদন তখনও বিলেতের আদবকায়দা আর জীবনধারণের মোহ কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'সেই সময়' উপন্যাসে পড়ি মধুসূদনের সঙ্গে এই হোটেলেই দেখা করতে এসেছিলেন স্বয়ং বিদ্যাসাগর।

কালের নিয়ম বোধহয় সবার ক্ষেত্রেই একই। একদিন যা গড়ে তা যত মহান আর অপূর্ব সৃষ্টিই হোক না কেন, ঠিকই চাপা পড়ে যায় পুরাতনের গর্ভে। এই সুসজ্জিত হোটেলও একসময় কালের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত হল। এমনই নিমজ্জিত হল যে আজ ওই একই রাস্তায় দাঁড়ালেও চট করে চোখেও পড়বে না এর অস্তিত্ব। টেলিফোন ভবনের উল্টো রাস্তার ঠিক কর্নারে, আর সেন্ট জন চার্চ এর পিছনের গেটের সামনে গিয়ে যখন দাঁড়াই, হিসেবমতো এ হোটেল ঠিক মুখের সামনে থাকার কথা। কিন্ত বদলে সেখানে কিছু ব্যাঙ্কের অফিস আর গাছ গজানো দেওয়াল। আসলে সেই সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বপু যত বাড়তে লাগল তত গভর্নর হাউসও ছড়াতে লাগল। সরকারি কাজের প্রয়োজনে গভর্নমেন্ট গভর্নর হাউসের আশেপাশের এলাকা দখল করতে লাগল। কোপ পড়ল স্পেন্সেসেও। সেই বিল্ডিং-এ পরে তৈরি হল ব্রিটিশ সরকারের ট্রেজারি দপ্তর। ১৮৮০ তে হোটেল উঠে গেল ওয়েলেসলি প্লেসে। অর্থাৎ জানবাজারের কাছে। কিন্ত সেখানে তো মূলত দেশীয় ব্যবসায়ীদের হাট এলাকা। তার ওপর জায়গায়ও ছোট। এসপ্ল্যানেড বা চৌরঙ্গীর আভিজাত্য আর বিলিতিয়ানা সেখানে কই? ফলে ক্রমশ সুনাম হারাল স্পেন্সেস। স্পেন্সেসের পাট ওঠার পরে সে বাড়ি খন্ডহর হতে বেশি সময়ও লাগায় নি।

কলকাতার এই হোটেলের অস্তিত্ব এখন গুগলের ম্যাপও দিতে পারে না। ফ্রেদ্রিক ফিবিগ নামের একজন লাটভিয়ান ফটোগ্রাফার যদি ১৮৫১ সালে 'স্পেন্সেস'-এর কয়েকখানা হ্যান্ড কালার্ড ফোটোগ্রাফি না করে রাখতেন আজ হয়ত তার রূপটাও জানা যেত না।

You can share this post!

Leave Comments